বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম:
সুপ্রিয় পাঠক, শুভেচ্ছা নিবেন। সারাবিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পড়তে আমাদের ওয়েব সাইট নিয়মিত ভিজিট করুন এবং আমার ফেসবুক ফ্যান পেজে লাইক দিয়ে ফলো অপশনে সি-ফাষ্ট করে সঙ্গেই থাকুন। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারে স্বল্পমূল্যে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- aznewsroom24@gmail.com ধন্যবাদ।
খালেদা জিয়ার কিছু হলে…

খালেদা জিয়ার কিছু হলে…

বিভুরঞ্জন সরকার: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হৃদরোগে আক্রান্ত। তার মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। হার্টের সমস্যা নিয়ে গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন খালেদা জিয়া। শনিবার এনজিওগ্রামের পর তার হার্টে ব্লক ধরা পড়ে। এরপর হার্টে রিং পরানোর পর থেকে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

রোববার খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ‘ম্যাডামের এনজিওগ্রাম করা হয়েছে, হার্টে রিং বসানো হয়েছে। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা এখন তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। পর্যবেক্ষণ শেষ হলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’

 খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে এবং তিনি সত্যি নানা রোগে আক্রান্ত। তার এই অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি না করে বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি সরকারবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার করতে গিয়ে বিএনপি যে সঠিক কাজ করেনি, এটা তারা যখন বুঝবে তখন হয়তো আর শোধরানোর সময় থাকবে না।

এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ১০ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড কাজ করছে। বোর্ডের এক সদস্য জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে। প্রধান ধমনিতে ৯৯ শতাংশ ব্লক, যেখানে রিং বসানো হয়েছে। অন্য দুটি ব্লকের করণীয় বিষয়ে এখনো কিছু ঠিক করা হয়নি। আপাতত ওষুধ দিয়ে ঠিক রাখার চেষ্টা চলছে। হার্টের অসুখ ছাড়াও বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দিতে হচ্ছে খুব সতর্কতার সঙ্গে; যে কারণে শিগগির তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব কঠিন।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে যুক্তরাজ্য থেকে তার পুত্রবধূ জোবাইদা রহমান চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিয়মিত খোঁজ রাখছেন বলে জানা গেছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি এবং তার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো।

গত রোববার রাজধানীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর (উত্তর ও দক্ষিণ) বিএনপি। সেখানে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সমাবেশ থেকে সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যদি খালেদা জিয়ার কোনো অঘটন ঘটে, এই দেশের মানুষ আপনাদের ক্ষমা করবে না। টেনেহিঁচড়ে আপনাদের ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেবে। পরিষ্কার করে বলতে চাই যে আমাদের শেষ কথা— অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠান। অন্যথায় সব দায়দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।’

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা যেমন নতুন নয়, তাকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিও নতুন নয়। বিএনপি এ নিয়ে অনেক হম্বিতম্বি করেছে, সরকারের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, কিন্তু সরকার তার অবস্থানে অনড়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তখনো বিএনপি হুংকার দিয়ে বলেছিল, ‘খালেদা জিয়ার কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো কিন্তু ঘরে ঘরে আর আগুন জ্বললো না। বিএনপির হুংকার স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকলো। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বলে আসছে। কিন্তু পতন না হয়ে সরকার এক মেয়াদ শেষ করে আরেক মেয়াদ অতিক্রম করে এখন টানা তৃতীয় মেয়াদ শেষ করতে চলেছে।

সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি লাগাতার কথার খই ফুটিয়ে চলেছে, তাতে সরকার কতটুকু দুর্বল হচ্ছে তা কে বলবে! বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারের পেছনে জনসমর্থন নেই, তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। যেকোনো সময় সরকারের পতন ঘটবে। বিএনপির বহু প্রত্যাশিত সেই ‘যেকোনো’ সময় কখন আসবে তা হয়তো বিএনপি নেতারাও জানেন না। ঝড়ে বকও মরছে না, ফকিরের কেরামতিও দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিচারিক আদালতে দেওয়া খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে ১০ বছর করা হলো, বিএনপি তখনো বলেছে, সরকারের পরিণতি ভালো হবে না। আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার বিএনপির ইচ্ছা পূরণে বাধ সেধেছে সরকারই। সরকারের নির্বাহী আদেশে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্ত সাপেক্ষে দণ্ড স্থগিত করে তাকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন থেকে তিনি তার গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায় আছেন।

কারাগারের বাইরে থাকলেও খালেদা জিয়া কোনো রাজনৈতিক তৎপরতায় সেভাবে নেই। হয়তো এটা তার কারাগারের বাইরে থাকার অন্যতম শর্ত। তিনি শর্ত ভঙ্গ করছেন না। কয়েক দফায় তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানে হয়েছে। এর মধ্যে একাধিকবার তিনি করোনাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ লম্বা সময় ধরে হাসপাতালেও থেকেছেন। তিনি অসুস্থ হলেই বিএনপির পক্ষ থেকে তার ‘জীবন সংশয়’ মর্মে প্রচার করে বিদেশে পাঠানোর দাবি তোলা হয়। তার চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয় বলেও তার ব্যক্তিগত দলীয় চিকিৎসকরা দাবি করেন।

প্রতিবারই দেশীয় চিকিৎসকদের চেষ্টায় তিনি সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরেন। তাই এটা বলা যায় যে, বারবার খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার কথা প্রচার করে বিএনপি নেতারা বিষয়টিকে এতটাই খেলো করে ফেলেছেন যে, তার মতো একজন বড় রাজনৈতিক নেত্রী, যিনি একাধিকবার দেশের সরকার প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন, অসুস্থতার খবর শুনে এখন অনেকের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি না হয়ে কৌতুককর মনে হয়।

এটা ঠিক যে, খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে এবং তিনি সত্যি নানা রোগে আক্রান্ত। তার এই অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি না করে বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন ছিল। বিষয়টিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার করতে গিয়ে বিএনপি যে সঠিক কাজ করেনি, এটা তারা যখন বুঝবে তখন হয়তো আর শোধরানোর সময় থাকবে না।

সরকার খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বাধা দিচ্ছে বলে বিএনপি যে অভিযোগ করছে তার জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। তাদের এত যদি ইচ্ছা হয় দেশের বাইরে থেকে চিকিৎসক আনুক অসুবিধা তো নাই’।

অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে হলে আদালতে জানাতে হবে বলে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, শুধু দেশে থেকেই খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিতে পারবেন। তাই খালেদা জিয়া যদি আরও কিছু চান, তাহলে তা আদালতে জানাতে হবে। আদালত সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেবেন। আদালত ছাড়া আমাদের রাস্তা খোলা নেই’।

বিএনপি এই খোলা রাস্তায় যেতে চায় না কেন? আন্দোলনের রাস্তা তো তারা নিজেরাই আগুন সন্ত্রাসসহ সহিংসতা চালিয়ে ঘোলা করে ফেলেছে। আন্দোলনের ডাকে মানুষ এখন শঙ্কিত হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর উপায় কি?

বিএনপি সরকারের সঙ্গে ক্রমাগত চরম বিরোধিতার নীতি নিয়ে পরস্পরের সম্পর্কটা বিদ্বেষপূর্ণ করে তুলেছে। পদ্মা সেতু নিয়ে খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতারা এত বিরূপ সমালোচনা করেছেন যে এখন সেই সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে সেসব সমালোচনার জবাব দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যে ভাষায় সেতু নিয়ে বিষোদগার করা হয়েছে, জবাবও তেমন চড়া শব্দেই তো হওয়ার কথা! কারণ এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাই তো করা হচ্ছে। বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুলের প্রবচন তো বাংলারই।

জোড়াতালি দিয়ে বানানো সেতু ভেঙে পড়বে বলার পর এখন সেটা না হলে একটু ‘চুবানি’ দেওয়ার তেতো বড়ি মুখ বেজার করে গলধকরণ না করে আবার উল্টো রাজনীতি কূটচাল দিতে গিয়ে বিএনপি কি বেশি পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পেরেছে? পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দাওয়াত পেলে তা থেকে নিজেদের দূরে না রাখলেই ভালো করা হবে। দূরত্ব অনেক বাড়িয়েছেন, এখন একটু কাছে আসার চেষ্টা করে দেখলে দোষ কি?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এজেড এন বিডি ২৪/ রেজা

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.




© 2021, All rights reserved aznewsbd24