বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম:
সুপ্রিয় পাঠক, শুভেচ্ছা নিবেন। সারাবিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পড়তে আমাদের ওয়েব সাইট নিয়মিত ভিজিট করুন এবং আমার ফেসবুক ফ্যান পেজে লাইক দিয়ে ফলো অপশনে সি-ফাষ্ট করে সঙ্গেই থাকুন। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারে স্বল্পমূল্যে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- aznewsroom24@gmail.com ধন্যবাদ।
সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন ও বিস্ফোরণ যে শোক ছড়িয়ে গেল সবখানে

সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন ও বিস্ফোরণ যে শোক ছড়িয়ে গেল সবখানে

  • ঘণ্টি শুনে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বেরিয়ে যান কুমিরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটাররা। ঘটনাস্থলে পৌঁছান ৫ মিনিটের মধ্যে।

  • শনাক্ত হয়নি, এমন একটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে গত মঙ্গলবার। নিখোঁজ আছেন আরও দুজন ফায়ার ফাইটার।
  • ৮০ ও ৫৪ শতাংশ পোড়া নিয়ে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দুজন।

অনলাইন ডেস্কঃ সীতাকুণ্ডের কুমিরা ফায়ার স্টেশনে আগুন লাগার ঘণ্টিটা বেজেছিল শনিবার রাত ৯টা ২৫ মিনিটে। ফায়ার ফাইটাররা স্টেশনে যে যাঁর মতো অলস সময় কাটাচ্ছিলেন তখন। ঘণ্টি শুনে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বেরিয়ে যান তাঁরা। সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোতে তাঁরা পৌঁছান পাঁচ মিনিটের মধ্যে। এই স্টেশনের তিনজন ফেরেননি, আর কখনো ফিরবেন না।

কুমিরা যখন পেরে উঠছে না, তখন ডাক পড়ে সীতাকুণ্ডের। বিস্ফোরণে মারা যান এই স্টেশনের টিম লিডারসহ ছয়জন। এর বাইরেও শনাক্ত হয়নি, এমন একটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে গত মঙ্গলবার। নিখোঁজ আছেন আরও দুজন। ৮০ ও ৫৪ শতাংশ পোড়া নিয়ে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দুজন।

স্বাধীনতার পর দায়িত্ব পালনকালে মারা গেছেন ১৭ ফায়ার ফাইটার। সীতাকুণ্ডে নিহতদের জন্য টাঙাতে হবে নতুন অনার বোর্ড।

৬১ ঘণ্টা সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোর আগুনের সঙ্গে লড়াই করে ফায়ার ফাইটাররা স্টেশনে ফিরতে শুরু করেছেন। সহকর্মীদের অনুপস্থিতিতে দুটি স্টেশন এখন খাঁ খাঁ করছে। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের বুকে শূন্যতার হাহাকার। এই শোক কুমিরা, সীতাকুণ্ডের ফায়ার স্টেশন থেকে ছড়িয়েছে সারা দেশে।

ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সিনিয়র স্টাফ অফিসার মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, অনার বোর্ডে আর জায়গা নেই। নতুন একটা অনার বোর্ড টাঙাতে হবে।

রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকায় ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ে ঢোকার মুখেই টাঙানো এই অনার বোর্ডে স্বাধীনতার পর থেকে নিহত ১৭ জন ফায়ার ফাইটারের নাম লেখা আছে সোনালি প্লেটে। সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে নয়জন ফায়ার ফাইটারের মৃতদেহ পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত। এত মানুষের নাম আর ধরেনি ওতে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, দলের মনোবল অটুট আছে। ফায়ার ফাইটাররা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব শেষ করে স্টেশনে ফিরবেন।

তবে কুমিরা বা সীতাকুণ্ড স্টেশনে বেঁচে ফেরা ফায়ার ফাইটার, লিডার ও স্টেশন অফিসারদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পাওয়া যায়নি গতকাল বুধবার। তাঁদের পক্ষ থেকে কথা বলেছেন ঢাকায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, ঘণ্টি বাজার পর প্রথমে একজন কর্মকর্তা, তিনজন ফায়ার ফাইটার ও গাড়িচালক ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের সঙ্গে পানি থাকে। ১০–১২ মিনিটের মাথায় যায় দ্বিতীয় দলটি। এটি ১০ জনের একটি দল। এই দলের সঙ্গে কিছুটা দূর থেকে পানি টেনে আনার ব্যবস্থা থাকে।

সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোর আগুন নেভাতে কোন গাড়িতে কতজন কখন পৌঁছেছেন, তার হিসাব–নিকাশ এখনো শেষ হয়নি। তাঁরা বলেন, যেখানে বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে, সেখানে কিছুটা দূর থেকে আগুন নেভাতে হয়। ডিপোতে কী আছে, তা জানা না থাকায় তাঁরা খুব কাছ থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন। এতেই এত মানুষ প্রাণ হারান।

কর্মকর্তারা বলছিলেন, ফায়ার স্টেশনগুলোয় ১৮-২১ বছর বয়সী এক ঝাঁক নবীন ফায়ার ফাইটার থাকেন। তাঁদের দেখভালের দায়িত্বে থাকেন তিনজন লিডার, আর পুরো দলের দায়িত্বে থাকেন স্টেশন অফিসার। ফায়ার ফাইটারদের কাছে এই স্টেশনটাই ঘরবাড়ি। মাসে দু-তিন দিনের ছুটি বাদে এখানেই থাকেন সব সময়ের জন্য। সহকর্মীরাই ভাই-বন্ধু ও স্বজন। স্টেশনে ফিরে এখন অনেকেই দেখছেন তাঁরা যাঁদের সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকতেন, বাড়ি থেকে নিয়ে আসা খাবার যাঁদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন, আড্ডা দিতেন বা গান করতেন—তাঁরা আর নেই।

ফেসবুকে এমন একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের ভিডিও আপলোড করেছেন মো. শফিউল সোহাগ। কুমিরা ফায়ার স্টেশনের নিহত ফায়ার ফাইটার মো. আলাউদ্দিনকে গান গাইতে দেখা যাচ্ছে সেখানে। গানের কথা, ‘আমরা সবাই অগ্নিসেনার দল,/ গতি সেবা ত্যাগ এই আমাদের বল।/ জনসেবার কাজে করব জীবন দান,/ দেশের ক্ষতি দেব না হতে, থাকতে মোদের প্রাণ।’

আলাউদ্দিনের ঠিক পাশে বসে সে সময় মাথা দোলাচ্ছিলেন কুমিরার লিডার আতিকুর রহমান। দুর্ঘটনার দিন পাহাড় ধসে উদ্ধার কার্যক্রম কেমন হবে, সেই প্রশিক্ষণ নিতে স্টেশন ছেড়ে আগ্রাবাদ গিয়েছিলেন তিনি। ফায়ার ফাইটারদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল আরেক লিডার মিঠু দেওয়ানের ওপর। সেদিনই অনেকগুলো আনারস সঙ্গে নিয়ে রাঙামাটি থেকে ফিরেছিলেন মিঠু। আতিকুরের হাতে দুটি আনারস ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ কথা বলে কেঁদে ফেলেন আতিকুর।

হতবিহ্বল আরেক ফায়ার ফাইটার রাকিব হাসান। টিম লিডার তাঁকে পাঠিয়েছিলেন গাড়িচালককে বলতে যেন পানির গতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। গাড়ির কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বিস্ফোরণে চোখের সামনে নিহত হতে দেখেন সহকর্মীদের। একরকম উড়ে এসে পড়ছিল একের পর এক সহকর্মীর মৃতদেহ।

একই অবস্থা সীতাকুণ্ডেও। দুদিন আগে স্টেশন অফিসার নুরুল আলম বলেন, আগুন নেভাতে যাওয়ার দুই ঘণ্টা আগেও তিনি নিপন চাকমার সঙ্গে এক কাপ চা দুই ভাগ করে খেয়েছেন। সেই নিপন আর বেঁচে নেই, এটা অবিশ্বাস্য।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, তাঁদের প্রশিক্ষণটাই এমন। গতি, সেবা ও ত্যাগ এই বাহিনীর মূল মন্ত্র। দেশের যেকোনো দুর্যোগে বাহিনীর সদস্যরা বুঝিয়েছেন, কোথাও আগুন লাগলে, কেউ ডুবে গেলে কিংবা কারও জীবন দুর্ঘটনার কারণে বিপন্ন হলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ছুটে যাবে।

পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কাছে সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে কর্মরত লিডার ইমরান হোসেন মজুমদার আর ফিরবেন না। ফিরবেন না রংপুরের ভ্যানচালক বাবার কাছে ফরিদুজ্জামান, দেড় মাসের কন্যাসন্তানের কাছে বাবা মনিরুজ্জামান কিংবা নববধূর কাছে রমজানুল ইসলামসহ তাঁদের বাকি ছয় সহকর্মী।

এজেড এন বিডি ২৪/ রেজা

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.




© 2021, All rights reserved aznewsbd24